শনিবার, ৭ই মার্চ ২০২৬, ২৩শে ফাল্গুন ১৪৩২ | ই-পেপার
ব্রেকিং নিউজ:
  • সারাদেশে জেলা ও উপজেলা প্রতিনিধি নিয়োগ করা হচ্ছে। আগ্রহী হলে আপনার সিভি ই-মেইল করতে পারেন। ই-মেইল daajkaal@gmail.com
সংবাদ শিরোনাম:
  • বঞ্চিতদের অগ্রাধিকার? সচিব পদে নতুন নিয়োগ নিয়ে জোর আলোচনা
  • সাংবিধানিক টানাপোড়েনের ইঙ্গিত? রাষ্ট্রপতির বক্তব্যে বাড়ছে জল্পনা
  • ‘এক-চীন নীতি’ পুনর্ব্যক্ত, কৌশলগত অংশীদারত্ব গভীর করার অঙ্গীকার
  • সংরক্ষিত আসন সংখ্যা বাড়ানোর প্রস্তাব, প্রার্থী নির্বাচন আরও বিস্তৃত হতে পারে
  • ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ ইস্যুতে অনলাইন উত্তাপ, জামায়াত আমিরের পোস্টে মিশ্র প্রতিক্রিয়া
  • গুণীজনদের হাতে একুশে পদক, বিকেলে বইমেলার দ্বার উন্মোচন
  • নতুন সংসদে স্পিকার-ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন এবং অধ্যাদেশ উপস্থাপনা নিয়ে শুরু হচ্ছে কার্যক্রম
  • কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন গঠনসহ সাংগঠনিক পুনর্গঠনে জামায়াতে ইসলামী
  • দায়িত্ব ছাড়ার পর লাল পাসপোর্ট হস্তান্তর: প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শুরু
  • সংসদের আগে না পরে? স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে নতুন আলোচনা

কিভাবে ইসরায়েলের নীতি গাজায় দুর্ভিক্ষ তৈরি করেছে

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত:
২৩ আগষ্ট ২০২৫, ১৮:০২

গাজা উপত্যকায় চলছে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। জাতিসংঘ-সমর্থিত খাদ্য নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের একটি প্রতিবেদন নিশ্চিত করেছে, গাজা শহর এবং এর আশেপাশের এলাকা এখন দুর্ভিক্ষের সম্মুখীন হয়েছে।

গাজার বর্তমান পরিস্থিতিকে জাতিসংঘ সমর্থিত বিশ্বখ্যাত ক্ষুধা পর্যবেক্ষক সংস্থা ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্লাসিফিকেশন (আইপিসি)-এর প্রতিবেদন ফেজ ৫-এ উন্নীত করেছে। ফেজ ৫ হলো দুর্ভিক্ষের সর্বোচ্চ ও সবচেয়ে ভয়াবহ মাত্রা।

অথচ গাজার সীমান্তে শত শত ত্রাণবাহী ট্রাক পড়ে আছে। আইসিপির সর্বশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, গাজার প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ দুর্ভিক্ষের শিকার। যা গাজার মোট জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশ। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, এই পরিস্থিতি ‘সম্পূর্ণ মানবসৃষ্ট।

’আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থাগুলো বার বার অভিযোগ করেছে, ইসরায়েল খাদ্য সহায়তার প্রবেশে বাধা দিচ্ছে।

আইপিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজা সিটি এলাকায় বসবাসকারী লোকেরা ক্ষুধা, দারিদ্র্য এবং মৃত্যুর সম্মুখীন হচ্ছে। এতে আরো দেখা গেছে, দুর্ভিক্ষ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। তাদের পূর্ভাভাস অনুসারে, সেপ্টেম্বরে গাজার বাকি অংশে দুর্ভিক্ষ দেখা দেওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

দুর্ভিক্ষ ঘোষণার জন্য আইপিসি তিনটি সূচক ব্যবহার করে। সেগুলো হলো, ক্ষুধা: অন্তত প্রতি ৫টি পরিবারের মধ্যে ১টি চরম খাদ্য সংকটে ভুগছে। অপুষ্টি: প্রতি ৩টি শিশুর মধ্যে ১টির বেশি গুরুতর অপুষ্টিতে আক্রান্ত। মৃত্যু: প্রতিদিন প্রতি ১০ হাজার মানুষের মধ্যে অন্তত ২ জন শুধুমাত্র ক্ষুধা বা অপুষ্টিজনিত রোগে মারা যাচ্ছে। এই তিনটির মধ্যে দুইটি সীমা অতিক্রম হলেই দুর্ভিক্ষ ধরা হয়।

আইপিসি জানিয়েছে, গাজার মৃত্যু পরিসংখ্যান পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় সব তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। তবু বিদ্যমান প্রমাণ ও বিশেষজ্ঞ মতামতের ভিত্তিতে তারা জানিয়েছে, মৃত্যুর সূচকও দুর্ভিক্ষের পর্যায়ে পৌঁছেছে।

হামাস নিয়ন্ত্রিত গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নতুন আরো ২টি শিশুর মৃত্যুতে অপুষ্টিজনিত মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৭৩ জনে, যার মধ্যে ১১২ জন শিশু। তবে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বারবার গাজায় খাদ্য সংকটের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, গাজায় ক্ষুধার জন্য দায়ী ত্রাণ সংস্থা ও হামাস।

ইসরায়েলের দাবি, সীমান্তে শত শত ট্রাক পড়ে আছে, কিন্তু জাতিসংঘসহ ত্রাণ সংস্থাগুলো সেগুলো সংগ্রহ করছে না। অন্যদিকে, আইপিসি-এর প্রতিবেদনে ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর অভিযোগে বলা হচ্ছে, গাজায় খাদ্য সহায়তা প্রবেশে ইসরায়েল এখনও বড় ধরনের বাধা দিচ্ছে। মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে প্রতিদিন অন্তত ৬০০ ট্রাক গাজায় প্রবেশ করা প্রয়োজন, অথচ বর্তমানে সেই সংখ্যার অর্ধেকও অনুমোদন করা হচ্ছে না।

‘সম্পূর্ণ মানবসৃষ্ট’ দুর্ভিক্ষ জাতিসংঘ ও ত্রাণ সংস্থাগুলো মাসের পর মাস ধরে সতর্ক করে আসছে, গাজায় দুর্ভিক্ষ রোধে পর্যাপ্ত পরিমাণ খাদ্যপণ্য সড়কপথে প্রবেশ করানো ছাড়া বিকল্প নেই। কিন্তু ইসরায়েলের আরোপিত সীমাবদ্ধতা চলতে থাকায় দুর্ভিক্ষ আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। এর শিকার গাজার সাধারণ মানুষ।

আন্তর্জাতিক চাপের মুখে গত মে মাসের শেষদিকে সীমিত আকারে পণ্য প্রবেশের অনুমতি দেয় ইসরায়েল। তবে আগের জাতিসংঘ পরিচালিত ৪০০ বিতরণকেন্দ্রের পরিবর্তে ইসরায়েলের তত্ত্বাবধানে বিতর্কিত মার্কিন সংস্থা গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশন (জিএইচএফ) দিয়ে নতুন বিতরণ ব্যবস্থা চালু করে। জিএইচএফ মাত্র ৪টি বিতরণকেন্দ্র পরিচালনা করে, যেগুলো সামরিক নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে অবস্থিত। ফলে ফিলিস্তিনিদেরকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে জীবন ঝুঁকি নিয়ে সেগুলোতে পৌঁছাতে হয়।

জাতিসংঘ জানিয়েছে, মে মাসের শেষ থেকে জিএইচএফ-এর আশপাশে অন্তত ৯৯৪ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের অধিকাংশ ইসরায়েলি সেনাদের গুলিতে মারা গেছেন। মোট ১ হাজার ৭৬০ জন সহায়তা সংগ্রহের চেষ্টায় নিহত হয়েছেন। ইসরায়েল এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।

জুলাইয়ের শেষদিকে ইসরায়েল কিছুটা সীমাবদ্ধতা শিথিল করে প্রতিদিন বেশি ট্রাক ঢোকার অনুমতি ও আংশিক যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেয়। এর ফলে কিছু পণ্যের দাম কিছুটা কমলেও অনেক পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে রয়ে গেছে। এক সময় ময়দার দাম প্রতি কেজি ৮৫ ডলারের ওপরে উঠে গিয়েছিল।

ইসরায়েল আকাশপথে ত্রাণ সরবরাহও শুরু করেছে, তবে জাতিসংঘ ও মানবিক সংস্থাগুলো এটিকে অকার্যকর ও ঝুঁকিপূর্ণ বলে সমালোচনা করেছে। এ ছাড়া হামাসের ত্রাণ চুরি নিয়ে ইসরায়েলের অভিযোগ আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়নি।

মার্কিন সরকারের একটি অভ্যন্তরীণ রিপোর্টসহ একাধিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামাসের মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে সহায়তা বণ্টন ব্যাহত হওয়ার প্রমাণ নেই। বরং ক্ষুধার্ত ফিলিস্তিনিদের ভিড় ও কিছু সংগঠিত চোরাকারবারী দলের কারণে ট্রাক লুটপাটের ঘটনা ঘটছে।

জাতিসংঘ সমর্থিত আইপিসি–এর দুর্ভিক্ষ সংক্রান্ত প্রতিবেদনের তীব্র সমালোচনা করেছে ইসরায়েলি সরকার। শুক্রবার একাধিক ইসরায়েলি কর্মকর্তা দাবি করেছেন, এই প্রতিবেদন হামাসের ‘প্রচারণার অংশ এবং অসত্য ও পক্ষপাতদুষ্ট।’

ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় উল্টো আইপিসিকে অভিযুক্ত করেছে ‘হামাসের ভুয়া প্রচারণার সঙ্গে মানানসই করে তৈরি করা মনগড়া রিপোর্ট’ প্রকাশের জন্য।

গাজার সীমান্ত পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ইসরায়েলি সেনা সংস্থা কগাট এক বিবৃতিতে এই প্রতিবেদনকে আখ্যা দিয়েছে ‘আংশিক তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি মিথ্যা ও পক্ষপাতদুষ্ট রিপোর্ট’ হিসেবে। ইসরায়েলের দাবি, আইপিসি দুর্ভিক্ষ শনাক্তের বৈশ্বিক মানদণ্ড পরিবর্তন করেছে। যেখানে আগে ৩০ শতাংশ জনগণ দুর্ভিক্ষে আক্রান্ত হতে হতো, সেখানে তা কমিয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়েছে। এ ছাড়া মৃত্যু হার সংক্রান্ত সূচককে ‘পুরোপুরি উপেক্ষা করা হয়েছে।’

আইপিসি এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। সংস্থাটি বলেছে, তারা দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠিত বৈশ্বিক মানদণ্ডই ব্যবহার করছে, যা পূর্বে একই ধরনের সংকট মোকাবিলায় ব্যবহৃত হয়েছে। ইসরায়েলের অভিযোগে বলা হয়েছে, আইপিসি হামাসের তথ্য ব্যবহার করেছে। এ প্রসঙ্গে সংস্থাটি জানিয়েছে, গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কিছু তথ্য নেওয়া হলেও যুদ্ধকালীন সময়জুড়ে আন্তর্জাতিক মহলে এই তথ্যগুলোকে সাধারণভাবে নির্ভরযোগ্য হিসেবে দেখা হয়েছে।

জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেন, ‘একটি দখলকারী শক্তি হিসেবে ইসরায়েলের আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী স্পষ্ট দায়িত্ব রয়েছে। যার মধ্যে জনগণের খাদ্য ও চিকিৎসা সরবরাহ নিশ্চিত করা অন্যতম। এ পরিস্থিতি অব্যাহত রাখা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’ জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা প্রধান টম ফ্লেচার দুর্ভিক্ষকে ইসরায়েলের ‘পদ্ধতিগতভাবে ত্রাণ আটকে রাখার’ সরাসরি ফল বলে মন্তব্য করেন।

যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি বলেন, ‘গাজায় পর্যাপ্ত ত্রাণ ঢুকতে না দেওয়ার কারণে ইসরায়েল সরকার এই মানবসৃষ্ট বিপর্যয়ের জন্য দায়ী। এটি একেবারেই নৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য।’ জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান ভলকার টার্ক আরো কঠোর ভাষায় বলেন, ‘যুদ্ধের কৌশল হিসেবে ক্ষুধা ব্যবহার করা যুদ্ধাপরাধ। এর ফলে যে মৃত্যুগুলো ঘটছে, তা ইচ্ছাকৃত হত্যার যুদ্ধাপরাধ হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।’

এই সপ্তাহে ইসরায়েল বিতর্কিত গাজা সিটি দখল ও দখলদারিত্বের জন্য কয়েক দশক হাজার রিজার্ভ সেনা মোতায়েনের অনুমোদন দিয়েছে। আইপিসি যে এলাকায় দুর্ভিক্ষের কথা জানিয়েছে, মূলত সেই অঞ্চলেই অভিযান চালানোর পরিকল্পনা করছে ইসরায়েল।

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, হামাসকে পরাজিত করা, যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটানো এবং ইসরায়েলি জিম্মিদের মুক্ত করতে এই দখলই ‘সেরা উপায়।’ এই অভিযানের ফলে গাজা সিটি ও আশপাশের প্রায় ১০ লাখ ফিলিস্তিনিকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করা হতে পারে।

ইসরায়েল ইতিমধ্যে চিকিৎসক ও ত্রাণ সংস্থাগুলোকে সম্ভাব্য সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নিতে বলেছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা, যেমন ইউনিসেফ, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এক যৌথ বিবৃতিতে এই অভিযানের সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

 

 

 


মন্তব্য করুন:

সম্পর্কিত খবর