প্রকাশিত:
১২ আগষ্ট ২০২৫, ১৭:৪৩
২২ মাস ধরে চলা যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে গাজা সিটিতে হামাসের শেষ শক্ত ঘাঁটিতে আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। তবে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঘনবসতিপূর্ণ শহর, সংকীর্ণ গলি, সুউচ্চ ভবন এবং হাজার হাজার সশস্ত্র যোদ্ধার প্রতিরোধে এই অভিযান হবে কঠিন ও ব্যয়বহুল।
রবিবার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গাজায় বিজয়ের রূপরেখা প্রকাশ করেন। তার নির্দেশে সেনারা গাজা সিটির শেষ হামাস ঘাঁটি এবং দক্ষিণে কেন্দ্রীয় শিবিরগুলিতে আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
যুদ্ধের আগে প্রায় ৭ লাখ ৬০ হাজার মানুষের বসবাস ছিল গাজা সিটিতে, যা ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের মধ্যে সবচেয়ে বড় নগর এলাকা। ২০২৩ সালের নজিরবিহীন হামাস হামলার পর, উত্তর দিক থেকে বাস্তুচ্যুত হাজার হাজার মানুষের আগমনে শহরের জনসংখ্যা আরো বেড়েছে। তীব্র বিমান হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত শহরে এখন উঁচু অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের পাশাপাশি তাঁবু ও অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র দাঁড়িয়ে আছে।
‘মৃত্যুর ফাঁদ’
সাবেক ইসরায়েলি জেনারেল আমির আভিভি (ইসরায়েলি ডিফেন্স অ্যান্ড সিকিউরিটি ফোরামের প্রধান) গাজা সিটিকে হামাসের ‘হৃদয়’ বলে অভিহিত করেছেন।
তার মতে, এখানে হামাসের সবচেয়ে শক্তিশালী ব্রিগেড অবস্থান করছে। নেতানিয়াহু বেসামরিক লোকজন সরিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানালেও তা বাস্তবায়ন কঠিন হবে।
আভিভির হিসাবে, প্রায় তিন লাখ বাসিন্দা যুদ্ধ শুরুর পরও গাজা সিটি ছাড়েনি। ইতিমধ্যে ইসরায়েল দক্ষিণে তথাকথিত মানবিক এলাকাতে লোকজন সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছে, কিন্তু সেখানে আরো মানুষ রাখার মতো জায়গা নেই।
সাবেক সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা মাইকেল মিলস্টেইন সতর্ক করে বলেছেন, ‘ওখানে আরো এক মিলিয়ন মানুষ পাঠানো সম্ভব নয়। এতে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় হবে।’
আভিভির মতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সমর্থিত গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশন বর্তমানে চারটি সাহায্যকেন্দ্র পরিচালনা করলেও তা বাড়িয়ে ১৬টিতে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে। যাতে মানুষ দক্ষিণে সরতে উৎসাহিত হয়।
তবে গাজার সিভিল ডিফেন্স সংস্থা অভিযোগ করেছে, এসব কেন্দ্রের কাছে প্রতিদিন ইসরায়েলি সেনারা বেসামরিক মানুষকে গুলি করে হত্যা করছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এগুলোকে ‘মৃত্যুর ফাঁদ’ বলে আখ্যায়িত করেছে আর জাতিসংঘসহ বিভিন্ন সংস্থা সাহায্যের সামরিকীকরণের নিন্দা জানিয়েছে।
‘স্ট্যালিনগ্রাদ’ ধরনের যুদ্ধ?
তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যালেস্টিনিয়ান স্টাডিজ প্রোগ্রামের প্রধান মিলস্টেইনের মতে, গাজা সিটিতে হামাসের ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার পর্যন্ত যোদ্ধা থাকতে পারে, যাদের অনেকেই সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত তরুণ। তার ভাষায়, ‘১৭ থেকে ১৯ বছর বয়সী এক তরুণকে আল-কাসাম ব্রিগেডে যোগ দিতে রাজি করানো খুব সহজ।’
তিনি আশঙ্কা করছেন, এই যুদ্ধ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী ‘স্ট্যালিনগ্রাদের যুদ্ধ’-এর মতো হতে পারে। গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীকে বিস্তৃত সুড়ঙ্গপথ, সম্ভাব্য জিম্মি, অস্ত্রাগার, লুকিয়ে থাকার জায়গা, আইইডি বিস্ফোরণ এবং মানবঢাল হিসেবে ব্যবহৃত বেসামরিক লোকজনের বাধার মুখোমুখি হতে হবে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের মাইরাভ জন্সাইন সতর্ক করেছেন, ‘সেখানে প্রবেশ করে জিম্মিদের প্রাণহানি ও বড় মানবিক বিপর্যয় এড়ানো প্রায় অসম্ভব।’
তিনি আরো বলেন, ‘বস্তুগত ধ্বংস হবে বিশাল। তারা কেবল সবকিছু ধ্বংস করে দেবে এবং তারপর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।’ যদিও ইসরায়েলি সেনাপ্রধান এয়াল জামির পরিকল্পনা নিয়ে ভেতরে ভেতরে ভিন্নমত থাকার খবর রয়েছে। তিনি সোমবার বলেছেন, ‘আমাদের বাহিনী গাজা সিটি দখল করতে পারবে, যেমনটি খান ইউনিস ও রাফাহতে করেছে। আমরা আগে এখানে অভিযান চালিয়েছি, আবারও তা করতে জানি।’
মন্তব্য করুন: