প্রকাশিত:
২৩ জুলাই ২০২৫, ১৮:০৬
জীবনের শেষ মুহুর্তেও দায়িত্বে অবিচল ছিলেন মাহরীন চৌধুরী। মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের একজন সমন্বয়ক তিনি। ঘরে তাঁর দুই সন্তান। তাঁর আরো ‘সন্তানরা’ থাকে স্কুলে।
জীবনের কঠিন সময়েও সেই সন্তানদের বিপদের মুখে ফেলে রেখে যাননি। চেয়েছিলেন যতটা সম্ভব কোমলপ্রাণগুলোকে আগুনের শিখা থেকে বাঁচাতে। শেষমেষ তাঁর ছাত্রছাত্রীদের বাঁচানোর জন্য জীবন দিয়েছেন। অনেক মায়ের নাড়িছেড়া ধনকে বাঁচিয়ে চলে গেলেন অনন্তলোকে।
যে ভবনটিতে বিমান বিধ্বস্থ হয় সেখানে ছিল ছোট ছোট শিশুরা। এদের বেশির ভাগই তৃতীয় এবং চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী। সেখানে থাকা এবং পরে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া ব্যক্তিরা বলছেন, শিক্ষার্থীদের বাঁচাতে গিয়ে মাহরীন নিজে বের হতে দেরি করেন।
মাহরীনের ছোট ভাই মুনাফ মজিব চৌধুরী বোনের মৃত্যুর খবর দিয়ে ফেসবুক পোস্টে লেখেন, ‘...মাহরীন আপু (মাহরীন চৌধুরী) আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন।
তিনি আমার বড় বোন। যিনি আমাকে মায়ের মতো করে বড় করেছেন।... ভবনে আগুন লাগার সময় তিনি সবার আগে নিজে বের হননি, বরং যতজন ছাত্রছাত্রীকে পারা যায়, বের করে আনার চেষ্টা করেছেন। এতে তাঁর শরীরের ১০০ শতাংশ অংশ পুড়ে যায়...।’
জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে লাইফ সাপোর্টে নেওয়ার আগে স্বামীর সঙ্গে খুবই অল্প সময় কথা হয় মাহরীনের।
তাঁর স্বামী মনসুর হেলাল গণমাধ্যমকে বলছিলেন, “মাহরীন বলেছেন-স্কুল ছুটির পর বাচ্চাদের নিয়ে বের হচ্ছিলেন। ঠিক তখনই গেটের সামনে বিমানটি বিধ্বস্ত হয়। নিজে দগ্ধ হলেও সেসময় তিনি বাচ্চাদের বাঁচানোর চেষ্টা করেন। শেষ রাতে হাসপাতালে ওর সঙ্গে আমার শেষ দেখা। আইসিইউতে শুয়ে শুয়ে ও আমার হাত নিজের বুকের সঙ্গে চেপে ধরেছিল। বলেছিল আমার সঙ্গে আর দেখা হবে না। আমি ওর হাত ধরতে গিয়েছিলাম, কিন্তু শরীরটা এমনভাবে পুড়ে গিয়েছিল যে ঠিকভাবে ধরতেও পারিনি।
তিনি আরও বলেন, আমি ওকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তুমি তোমার নিজের দুই সন্তানের কথা একবারও ভাবলে না? সে বলেছিল, ‘ওরাও তো আমার সন্তান। ওদের একা রেখে আমি কী করে চলে আসি?’
মনসুর হেলাল বলেন, ও অনেক ভালো মানুষ ছিল। ওর ভেতরে একটা মায়া ছিল সবাইকে ঘিরে। আগুন লাগার পর যখন অন্যরা দৌড়াচ্ছিল, ও তখন বাচ্চাদের বের করে আনছিল। কয়েকজনকে বের করার পর আবার ফিরে গিয়েছিল বাকি বাচ্চাদের জন্য সেই ফেরাটা আর শেষ হয়নি। সেখানেই আটকে পড়ে, সেখানেই পুড়ে যায় আমার মাহরীন।
মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের স্কুল শাখার হেড পিয়ন মো. নূরন্নবী (মনা) বলেন, ‘ছুটির সময় মেহরীন মিস, মাহাফুজা মিস আর আমি সব সময় গেটে থাকি। ঘটনার সময় আমারও সেখানেই থাকার কথা। আমি মেহেরীন ম্যাডামকে বলে ল্যাপটপ আলমারিতে রাখতে কো-অর্ডিনেটর রুমে যাই। তখন বিকট শব্দ শুনে যেখান থেকে বের হয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়াই। দেখি আগুন আর ধোঁয়া। কিভাবে সেখান থেকে বের হয়েছি বলতে পারব না।’
মাহরীন চৌধুরী সম্পর্কে তিনি বলেন,‘ তিনি খুব ভালো মানুষ ছিলেন। তাঁর দায়িত্ব ছিল ছাত্রছাত্রীদের সুষ্ঠুভাবে অভিভাবকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া। তিনি দায়িত্বের ব্যাপারে সচেতন ছিলেন। একজন শিক্ষার্থী থাকতেও তিনি কখনও স্কুল থেকে বের হয়ে যেতেন না। দূর্ঘটনার দিনও তিনি তাঁর দায়িত্ব পালন করছিলেন।’
মাহরীন চৌধুরী ম্যাডামকে শ্রদ্ধা জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক পোস্ট চোখে পড়ছে। তাঁর ছাত্রছাত্রীরা তাঁকে ‘বীর’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
মাহেরিনের জন্ম ৬জুন ১৯৭৯ সালে, নীলফামারীর জলঢাকা পৌর এলাকায়। মোহিতুর রহমান চৌধুরী ও ছাবেরা চৌধুরী দম্পত্তির বড় সন্তান তিনি। শাহীন স্কুল এন্ড কলেজ থেকে এসএসসি ১৯৯৫ ও এইচএসসি ১৯৯৭ সালে পাশ করেন। এরপর তিতুমীর কলেজ থেকে ইংরেজিতে অনার্স ও মাষ্টার্স শেষ করেন। তিনি ২০০২ সালে মাইলস্টোন স্কুলে ইংরেজি শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন।
মন্তব্য করুন: