শনিবার, ৭ই মার্চ ২০২৬, ২৩শে ফাল্গুন ১৪৩২ | ই-পেপার
ব্রেকিং নিউজ:
  • সারাদেশে জেলা ও উপজেলা প্রতিনিধি নিয়োগ করা হচ্ছে। আগ্রহী হলে আপনার সিভি ই-মেইল করতে পারেন। ই-মেইল daajkaal@gmail.com
সংবাদ শিরোনাম:
  • বঞ্চিতদের অগ্রাধিকার? সচিব পদে নতুন নিয়োগ নিয়ে জোর আলোচনা
  • সাংবিধানিক টানাপোড়েনের ইঙ্গিত? রাষ্ট্রপতির বক্তব্যে বাড়ছে জল্পনা
  • ‘এক-চীন নীতি’ পুনর্ব্যক্ত, কৌশলগত অংশীদারত্ব গভীর করার অঙ্গীকার
  • সংরক্ষিত আসন সংখ্যা বাড়ানোর প্রস্তাব, প্রার্থী নির্বাচন আরও বিস্তৃত হতে পারে
  • ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ ইস্যুতে অনলাইন উত্তাপ, জামায়াত আমিরের পোস্টে মিশ্র প্রতিক্রিয়া
  • গুণীজনদের হাতে একুশে পদক, বিকেলে বইমেলার দ্বার উন্মোচন
  • নতুন সংসদে স্পিকার-ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন এবং অধ্যাদেশ উপস্থাপনা নিয়ে শুরু হচ্ছে কার্যক্রম
  • কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন গঠনসহ সাংগঠনিক পুনর্গঠনে জামায়াতে ইসলামী
  • দায়িত্ব ছাড়ার পর লাল পাসপোর্ট হস্তান্তর: প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শুরু
  • সংসদের আগে না পরে? স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে নতুন আলোচনা

ধর্মীয় ও নৈতিক অবক্ষয়ে বাড়ছে অবমানবিকতা

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত:
১৪ জুলাই ২০২৫, ১৪:৪৫

রাজধানীর মিটফোর্ড এলাকায় সম্প্রতি ঘটে যাওয়া এক হৃদয়বিদারক ঘটনা গোটা জাতির বিবেককে নাড়া দিয়েছে। একজন নিরীহ ব্যবসায়ীকে পাথর মেরে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। এই বর্বরতা, এই পাষণ্ডতা সভ্য সমাজে কল্পনাও করা যায় না। অথচ আমরা তা নিজের চোখে দেখছি, সংবাদপত্রের শিরোনামে পড়ছি, ভিডিও চিত্রে প্রত্যক্ষ করছি।

প্রশ্ন জাগে, কোন সমাজে আমরা বাস করছি? মানুষ কি এতটাই নিষ্ঠুর, এতটাই বেহায়া হয়ে গেছে যে সামান্য অর্থের বিনিময়ে জীবন কেড়ে নেওয়ার মতো ঘৃণ্য অপরাধ করতে দ্বিধাবোধ করে না? ভাবতেও গা শিউরে ওঠে যে একটি মানুষের জীবন আজ এতটাই তুচ্ছ যে সামান্য টাকার জন্যও তা হারাতে হয়! জাহিলিয়াত আজ যেন হার মানিয়েছে এসব দুর্ধর্ষ হত্যাকাণ্ডের কাছে।

একসময় মানুষ অন্ধকারে সন্তান কবর দিত, আজ আলোর জগতে মানুষ পাথর দিয়ে অপরাধহীন মানুষকে হত্যা করে। পার্থক্য শুধু কালের, মনোভাবের নয়। সেই জাহিলি মানসিকতা আজও টিকে আছে, বরং আরো ভয়ংকর ও নগ্নভাবে আত্ম প্রকাশ করছে।

আমরা যদি বাস্তবতার মুখোমুখি হই, দেখব চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, খুন, গুম, ধর্ষণ—এগুলো আজ আর বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধ নয়; বরং প্রতিটি অপরাধ একটি পূর্ণাঙ্গ নেটওয়ার্কের অংশ। একটি দুষ্টচক্র, একটি অবৈধ রাজনীতি, একটি অপরাধপুষ্ট প্রশাসনিক শিথিলতা এর পেছনে সক্রিয়। আর সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার হলো, এই অপরাধীদের অনেকেই সামাজিক, রাজনৈতিক, এমনকি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর নাগালেই নিরাপদ জীবন যাপন করে যাচ্ছে।

বিচারব্যবস্থায় শ্লথ গতি, তদন্তে পক্ষপাতিত্ব, পুলিশি গাফিলতি, রাজনৈতিক প্রভাব, অপরাধীর পরিচয় আড়াল করা—এসবই অপরাধীদের উৎসাহ দেয়।

যখন একজন অপরাধী দেখে, সে অপরাধ করে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াতে পারে, তখন সে শুধু খুন নয়, আরো বড় অপরাধ করতে দ্বিধাবোধ করবে না।

বিচারহীনতা যেকোনো সমাজে অপরাধ বৃদ্ধির প্রধান কারণ। বাংলাদেশেও এর ব্যতিক্রম নয়। মিটফোর্ড হত্যার মতো ঘটনা যদি দ্রুততম সময়ে বিচার না পায়, যদি খুনিদের সর্বোচ্চ শাস্তি না হয়, তাহলে এই হত্যাকাণ্ডের আলোচনাও কয়েক দিন পর থেমে যাবে। শুধু এখানেই শেষ নয়, এই হত্যাকাণ্ড আরো হত্যাকাণ্ড টেনে নিয়ে আসবে, তা বলাই বাহুল্য।

এই চরম নির্মমতা ও পাশবিকতার পেছনে সবচেয়ে বড় যে কারণ, তা হলো, আমাদের নৈতিকতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়। আমাদের সমাজ থেকে দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে নৈতিকতা ও ধর্মীয় জ্ঞান। আজ শিশুদের শিক্ষা শুধু চাকরি পাওয়ার জন্য, চরিত্র গঠনের জন্য নয়। ফলে সমাজে তৈরি হচ্ছে এক শ্রেণির ‘শিক্ষিত বর্বর’, যারা আইন জানে, সমাজ জানে, কিন্তু বিবেকহীন।

একটি সমাজ তখনই নিরাপদ হবে, যখন মানুষ নৈতিকতা ও ধর্মীয় চেতনায় ফিরে আসবে; তাহলে তারা অপরাধ থেকেও দূরে থাকবে। আমাদের পাঠ্যপুস্তকে, মসজিদ-মাদরাসায়, স্কুল-কলেজে খুন, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে তীব্র ঘৃণা সৃষ্টি করতে হবে। মানুষকে আল্লাহভীতি ও মানবিকতা শেখাতে হবে। কোরআনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে :

‘যে ব্যক্তি একজন নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করে, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা করল।’

(সুরা : মায়িদা, আয়াত : ৩২)

খুনের ঘটনায় মৃত্যুদণ্ডের বিধান থাকলেও তার বাস্তবায়ন খুবই ধীরগতি। দীর্ঘসূত্রতার কারণে অপরাধীরা উৎসাহ পায়। এ জন্য প্রথম কাজ হলো দ্রুত বিচারের আওতায় এনে অপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা। পাথর দিয়ে হত্যার মতো জঘন্য অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ড ছাড়া অন্য কোনো শাস্তি যথেষ্ট নয়। আর এই শাস্তি হতে হবে দৃষ্টান্তমূলক ও দ্রুত, যাতে ভবিষ্যতে কোনো খুনী এমন কাজ করতে সাহস না পায়। আইন যত দিন দুর্বল থেকে যাবে, অপরাধী তত দিন সাহসী হয়ে উঠবে।

চাঁদাবাজি ও খুন দমনে সাংবাদিক এবং গণমাধ্যমকে স্বাধীন ও দায়িত্বশীল হতে হবে। সোহাগ হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনাগুলো তুলে ধরার পাশাপাশি, সঠিক তদন্ত প্রতিবেদন, অপরাধীর অতীত ইতিহাস এবং দায়িত্বশীল মহলের ভূমিকা জনগণের সামনে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরতে হবে।

চাঁদাবাজি ও অপরাধ দমনে নৈতিক ও শান্তিপ্রিয় মানুষদের সংঘবদ্ধ হতে হবে। প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় অপরাধ প্রতিরোধ কমিটি গঠন করে, সন্দেহভাজনদের ওপর নজরদারি চালিয়ে প্রশাসনের সহায়তায় সুশৃঙ্খল সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। সিসিটিভি, আলোকসজ্জা, স্থানীয় নজরদারির মাধ্যমে চাঁদাবাজদের মোকাবেলা করতে হবে। ভয় নয়, সাহসী প্রতিবাদই হতে পারে সমাজ রক্ষার ঢাল।

সোহাগের মৃত্যু শুধু একটি প্রাণের মৃত্যু নয়, এটি আমাদের সমাজের বিবেকের মৃত্যু। আমরা যদি আজ জেগে না উঠি, প্রতিবাদ না করি, প্রতিরোধ গড়ে না তুলি, তবে আগামীকাল হয়তো আমাদের কেউ এ রকম বর্বরতার শিকার হবে। সেদিন কেবল আফসোস করার মতো কিছুই আর অবশিষ্ট থাকবে না।

আমরা চাই, রাষ্ট্র জেগে উঠুক। বিচার বিভাগ কার্যকর হোক। প্রশাসন নিরপেক্ষ হোক। আর জনগণ সাহসী হোক। তাহলেই খুন-চাঁদাবাজির এই অভিশাপ থেকে মুক্তি সম্ভব। আমরা বলতে পারব, এ দেশ আলোর দেশ, এখানে অন্ধকারের ঠাঁই নেই।

 


মন্তব্য করুন:

সম্পর্কিত খবর