প্রকাশিত:
২৫ জুন ২০২৫, ১২:৪৫
ভোলা সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী ও ছাত্রদলকর্মী সুকর্ণা আক্তার ইস্পিতার মৃত্যু নিয়ে তৈরি হয়েছে ধুম্রজাল। এরই মধ্যে গত ২৩ জুন লক্ষ্মীপুর থানায় মেয়ে হত্যার বিচার চেয়ে দায়ের করা ইস্পিতার বাবা মাসুদ রানার অভিযোগটি নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। লঞ্চ থেকে নদীতে ঝাঁপ দেওয়ার পর প্রথমে লঞ্চে ধর্ষণের শিকার হওয়ার অভিযোগ ওঠে। পরবর্তী মরদেহ পাওয়ার পর জেলা ছাত্রদল সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন ও কলেজ ছাত্রদলের যুগ্ম আহবায়ক আরাফাত ইসলাম ইফতিকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা গুঞ্জন ওঠে।
যদিও এই দুই নেতা বিষয়টি মিথ্যা ও ষড়যন্ত্র বলে দাবি করেছেন।
অভিযোগে ইস্পিতার বাবা মো. মাসুদ রানা ইস্পিতার সঙ্গে মেহেদী হাসান বাপ্পী নামের এক ছেলের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক ছিল বলে উল্লেখ করেছেন। এমনকি ওই ছেলে বিবাহিত থাকা সত্বেও এটি পোপন করে তার মেয়ের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলেন। বিষয়টি জানতে পেরে ইস্পিতা ওই ছেলের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়।
এটি নিয়ে মেহেদী হাসান বাপ্পী ইস্পিতার সঙ্গে কয়েকবার ঝগড়া বিবাদ করে ইস্পিতার পারিবারিক জীবন দুর্বিসহ করে তোলে।
অভিযোগে তিনি আরো উল্লেখ করেন, গত ২০২৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার আঞ্জুরহাট এলাকার বাসিন্দা মো. নুর নবীর ছেলে মো. মেহেদী হাসান মিরাজের সঙ্গে পাঁচ লাখ টাকার দেনমোহরে পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়। মেয়ে পড়ালেখা করায় তাকে এখনো শ্বশুর বাড়িতে তুলে দেননি। গত ৫/৬ মাস আগে তার মেয়েকে কোনো কারণ ছাড়াই ডিভোর্স দেয় মেহেদী হাসান মিরাজ।
বিষয়টি নিয়ে ইস্পিতা বাদী হয়ে পারিবারিক আদালতে মামলা করেন। পারিবারিক আদালতে মামলা করার পর মেহেদী হাসান মিরাজ ইস্পিতা ও তার বাবার বিরুদ্ধে চরফ্যাশন সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যজিস্ট্রেট আদালতে একটি সিআর মামলা দায়ের করেন। এরপর থেকে মেহেদী হাসান ইস্পিতা ও তার বাবাকে বিভিন্নভাবে হুমকি-ধামকি দেয়। পরে ইস্পিতার বাবা বাদী হয়ে ভোলার এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি এম.পি মামলা দায়ের করেন। এ মামলাগুলো চলমান রয়েছে।
অভিযোগে মাসুদ রানা উল্লেখ করেন, ইস্পিতা গত ১৭ জুন সকাল ৮টার দিকে বাসা থেকে প্রাইভেট পড়ানোর জন্য বের হয়ে আর ফেরত না আসায় তিনি বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও পাননি। তিনি ও তার স্ত্রী মেয়ের মোবাইল নম্বরে ১৮ জুন বিকাল ৩টা পর্যন্ত একাধিকবার ফোন করলে রিং বাজলেও কেউ ফোন ধরেনি। এরপর থেকে তার মোবাইলটি বন্ধ পাওয়া যায়। তিনি গত ২০ জুন ভোলা সদর থানায় একটি জিডি করেন এবং ঘটনার পর থেকে তারা চতুর্দিকে খোঁজ-খবর নিতে থাকেন।
পরবর্তীতে ফেসবুকের মাধ্যমে জানতে পারেন ১৭ জুন ভোলা ইলিশা থেকে ঢাকাগামী এমভি কর্নফুলী-৪ লঞ্চের ৩৫৯ নম্বর কেবিনের একজন মেয়ে যাত্রী লঞ্চ থেকে পানিতে পড়ে মারা গেছে। ওই লাশ লক্ষ্মীপুরের মজু চৌধুরীর ঘাট নৌ পুলিশ ফাঁড়ি উদ্ধার করে। উক্ত বিষয়ে নৌ-পুলিশ বাদী হয়ে লক্ষ্মীপুর সদর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। তার মেয়েকে বা কারা কৌশলে গত ১৭ জুন থেকে ২০ জুন তারিখের মধ্যে হত্যা করে লাশ গুমের উদ্দেশে লঞ্চ থেকে মেঘনা নদীতে ফেলে দেয়। তিনি দেশের প্রচলিত আইনে বিচার প্রার্থী।
মঙ্গলবার সকালে ইস্পিতার বাড়িতে গেলে তার মা ইয়ানুর বেগম ইস্পিতার বিয়ের বিষয়টি স্বীকার করলেও প্রেমের বিষয়টি স্বীকার করেননি। তিনি জানান, গত দেড় বছর আগে চরফ্যাশন উপজেলার মেহেদী হাসান মিরাজের সঙ্গে বিয়ে হলেও পড়ালেখা করায় মেয়েকে তুলে দেননি। তবে ইস্পিতা শ্বশুর বাড়িতে দুইবার গেছে। দুই-তিন দিন থেকে আবার চলে আসছে। কিন্তু মেহেদী হাসান মিরাজ তাদের বাড়িতে আসতে চাইতো না। পরবর্তীতে গত ৫-৬ মাস আগে হঠাৎ করে তাদের বাড়িতে তালাকনামা পাঠায় মিরাজ। এরপর তারা মামলা করেন।
মা ইয়ানুর বেগম আরো জানান, দুই বোন এক ভাইয়ের মধ্যে ইস্পিতা সবার বড়। ইস্পিতা এসএসসিতে ৪.৩৮ ও এইচএসসিতে এ-প্লাস পেয়ে বিজ্ঞান বিভাগে উত্তীর্ণ হয়েছেন। এর পর ভোলা সরকারি কলেজে অনার্সে ভর্তি হন। সে পড়ালেখায় ভালো ছিল। প্রাইভেট পড়িয়ে নিজের পড়ারেখার খরচের পাশাপাশি ছোট ভাই-বোনকেও খরচের টাকা দিতেন। ভালো বক্তব্য দিতে জানতো বলে কলেজের সহপাঠীরা তাকে রাজনৈতিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ডাকতেন। তাকে কমিটিতে পদ দেওয়ার কথাও বলেছেন সহপাঠীরা। কি কারণে তার মেয়ের মৃত্যু হয়েছে তা তিনি জানেন না। তবে সে কি আত্মহত্যা করেছে নাকি তাকে হত্যা করা হয়েছে তিনি কিছুই জানেন না। তবে এ ঘটনার সঠিক বিচার দাবি করেন তিনি।
বাবা মো. মাসুদ রানা জানান, ইস্পিতা নিখোঁজ হওয়ার তিন-চার দিন আগে বোরহানউদ্দিননের এক ছেলের সঙ্গে প্রেম সম্পর্কিত বিষয় নিয়ে ঝগড়া হয়েছে। তিনি এ ঘটনায় কাউকে দায়ী করছেন না। তবে এ বিষয়ে সঠিক তদন্তের মাধ্যমে মূল রহস্য উদঘাটনের দাবি করেন তিনি।
ভোলা সরকারি কলেজের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. কামাল হোসেন কালের কণ্ঠকে জানান, সুকর্ণা আক্তার ইস্পিতা একজন মেধাবী শিক্ষার্থী ছিলেন। সে পড়ালেখায় খুব ভালো ছিল। বলা যায় গরীবের ঘরে রত্ন। গত দুই মাস আগে শিক্ষার্থীরা ইস্পিতাকে তার কাছে নিয়ে এসে জানিয়েছেন, সে চার তলা ভবন থেকে লাভ দিতে গেছেন। এ অবস্থায় তার বাবাকে ডেকে এনে তার সঙ্গে বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর পর কি হয়েছে তা তিনি কিছুই জানেন না।
কলেজ ছাত্রদল যুগ্ম আবহায়ক আরাফাত ইসলাম ইফতি জানান, সামনে কলেজ কমিটি গঠন নিয়ে কিছু বিরোধ আছে। তিনি সভাপতি প্রার্থী হওয়ায় নিজ দলীয় প্রতিপক্ষ কিছু অপপ্রচার চালাচ্ছেন। এ ঘটনার সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নাই। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপপ্রচারকারীদের বিরুদ্ধে মঙ্গলবার (২৪ জুন) ভোলা সদর মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছেন।
ভোলা জেলা ছাত্রদল ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জসিম উদ্দিন জানান, ইস্পিতার সঙ্গে তাদের দলীয় সম্পর্ক। ভোলার ভেদুরিয়ায় প্রাণ আরএফএলের জমি নিয়ে একটি গ্রুপের সঙ্গে তার পরিবারের বিরোধ আছে। ওই বিরোধ ভিন্নখাতে নেওয়ার জন্য একটি পক্ষ অপপ্রচার করছে। তিনি ইস্পিতার মৃত্যুর সঠিক তদন্তের দাবি করে অপপ্রচারকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান।
লক্ষ্মীপুর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) ঝলক মোহন্ত ইস্পিতার বাবার অভিযোগের বিষয়টি নিশ্চিত করে কালের কণ্ঠকে জানান, যেহেতু নৌ-পুলিশ বাদী হয়ে আগেই একটি অজ্ঞাতনামা হত্যা মামলা করেছে তাই তারা অভিযোগটি রেকর্ড করে মজু চৌধুরী ঘাটের নৌ-পুলিশের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছেন। নৌ-পুলিশ মামলাটি তদন্ত করছেন।
মজু চৌধুরীঘাট নৌ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ পরির্দশক মো. আজিজুল হক কালের কণ্ঠকে জানান, ২৩ জুন ওই তরুণীর বাবা লক্ষ্মীপুর থানায় একটি অভিযোগ দিয়ে মামলাটির সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। ঘটনাটি সরেজমিনে তদন্তের জন্য তারা ২৪ জুন ইলিশাঘাটে এসেছেন। সেখানে বিভিন্ন লোকজনের সঙ্গে কথা বলেছেন। তবে তদন্ত চলমান থাকায় তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
ভোলা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু সাহাদাৎ মো. হাচনাইন পারভেজ কালের কণ্ঠকে জানান, এই ঘটনায় লক্ষ্মীপুর থানায় হত্যা মামলা হয়েছে। মামলটি নৌ পুলিশ তদন্ত করছে। মামলার তদন্ত কাজে নৌ পুলিশকে তারা সহযোগীতা করছেন।
মন্তব্য করুন: